রাজশাহীর মোল্লাপাড়ায় পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো এখনও শঙ্কায় আছেন। তারা পূর্ণ নিরাপত্তায় নিজেদের ৫৩ বছরের পুরনো বসতবাড়িতে থাকতে চান। ৫৩ বছরের ভিটা থেকে উচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। এ পরিস্থিতি তাদের উচ্ছেদের আয়োজন আপতত বন্ধ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়া। ৫৩ বছর আগে এখানে ১৬ কাঠা জমিতে বাড়ি করে বসবাস শুরু করে পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের ছয়টি পরিবার। তিন প্রজন্মে ৬টি বাড়ি এখন ১৬টি হয়েছিল। এই অবস্থায় তাদের ভিটে থেকে ‘উচ্ছেদের আয়োজন’ করছেন সাজ্জাদ আলী নামের এক ব্যক্তি। নগরের হড়গ্রাম এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ আলীর দাবি, তিনি ১৯৯৪ সালে এই জমি কিনেছেন।
ঘরভিটে ছেড়ে যাওয়ার আগে এই পরিবারগুলোকে ‘খাসি খাওয়ানোর’ কথা ছিল গত শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর)। শুধু তা–ই নয়, উচ্ছেদের শিকার পরিবারগুলোকে তিনি পুনর্বাসনের জন্য মোট ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে আদিবাসীপাড়া হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় গত বৃহস্পতিবার হাজির হন পুলিশ প্রশাসন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমকর্মীরা। আপাতত সেই উচ্ছেদের আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে ফয়সালা হওয়ার আগপর্যন্ত পাহাড়িয়া পরিবারগুলো সেখানেই থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে উচ্ছেদের এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই খোঁজ নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। তিনি দলের স্থানীয় নেতাদের পাহাড়িয়াদের পাশে থাকতে বলেছেন। এছাড়া পাশে আছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক কৈলাশ চন্দ্র রবিদাস জানান, তার দলের প্রধান নাহিদ ইসলামও বিষয়টি অবগত। তিনিও পরিবারগুলোর পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। জেলা সমন্বয়ক কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী শামীমা সুলতানা মায়া সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছেন।
তাছাড়া আইনি সহায়তা নিয়ে পাশে আছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংস্থার রাজশাহী ইউনিটের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট সামিনা বেগম। এছাড়া জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী গবেষণা পরিষদ, সিসিবিভিও, পাহাড়িয়া ছাত্র পরিষদ, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, জুলাই-৩৬ পরিষদসহ নানা সংগঠন।
শুক্রবার পাহাড়িয়া মহল্লায় গিয়ে মানববন্ধন করেছেন রাজশাহীর বিক্ষুব্ধ নাগরিক, মানবাধিকারকর্মী, আদিবাসী সংগঠনের নেতা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার, আদিবাসী গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, বাসদের জেলা সদস্য সচিব শামসুল আবেদীন ডন, এনসিপি নেত্রী শামীমা সুলতানা মায়া, মানবাধিকারকর্মী আরিফ ইথার, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হেমব্রম, দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ লাকড়া, পাহাড়িয়া ছাত্র পরিষদের উত্তম সিংহ প্রমুখ।
মানববন্ধনে এক পাহাড়িয়া নারী বলেন, ‘আমাদের দাবি আমরা এখানেই থাকতে চাই। এই জায়গা আমরা ছাড়তে চাই না।’
জানা গেছে, ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানায় আবেদন করেছেন। এতে বলা হয়, সাজ্জাদ আলী তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বসতবাড়ি থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করছেন। তারা খুবই ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাজ্জাদ আলী বলেন, ‘আমি কোনো ভয় দেখাচ্ছি না। আমি সুন্দরভাবেই বিদায় দিতে চেয়েছিলাম। জমি আমার, আমি এটা ভূমি অফিসকে বলেছি।’
কাশিয়াডাঙ্গা থানার ওসি আজিজুল বারী বলেন, ‘নিরাপত্তা চেয়ে পাহাড়িয়া পরিবারের পক্ষে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তার আপাতত সংকট নেই। আমরা পাশে আছি।’