দেশের সবচেয়ে দূষিত ১৩টি নদী পুনরুদ্ধারে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রতিটি নদীর জন্য আলাদা প্রকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব নদী দূষণ, দখল ও ভরাটের কারণে মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করা হবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ৬৪ জেলার ৬৪টি নদী পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে ১৩টি নদীকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নদীগুলো হলো—গাজীপুরের লবণদহ, নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া, রংপুরের শ্যামাসুন্দরী, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, চট্টগ্রামের হালদা, কক্সবাজারের বাঁকখালী, হবিগঞ্জের সুতাং, খুলনার সালতা, রংপুরের আলাইকুড়ি, কিশোরগঞ্জের মগড়া, রাজশাহীর বড়াল, বগুড়ার করতোয়া এবং নাটোরের বারনই।
মন্ত্রণালয়ের সদ্য বিদায়ী সচিব নাজমুল আহসান বণিক বলেন, “আমরা ১৩টি নদী নিয়ে কাজ শুরু করেছি। প্রতিটি নদীর জন্য ছোট ছোট প্রকল্প করা হচ্ছে। কিছু প্রকল্প ইতোমধ্যেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, বাকিগুলো প্রস্তুত হচ্ছে।”
প্রকল্প বাস্তবায়নে দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দূষণের উৎস বন্ধ করা এবং যেখানে নদী ভরাট হয়ে গেছে সেসব স্থানে খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য প্রতিটি নদীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন বাজেট নির্ধারণ করা হচ্ছে।
কোনো নদীর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা, আবার কোনো নদীর জন্য ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাজেট ধরা হয়েছে। তবে কোনো নদীর জন্য ব্যয় ৫০ কোটির বেশি হবে না। সবগুলো নদী মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
নদী দূষণ নিয়ে গবেষণা করা বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) জানায়, ২০২২ সালে পরিচালিত এক সমীক্ষায় গাজীপুরের লবণদহ, নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া এবং হবিগঞ্জের সুতাংকে দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, এসব নদীর পানিতে পিএইচ মান স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক কম। যেমন—লবণদহে পিএইচ ৫, হাঁড়িধোয়ায় ৪ দশমিক ১ এবং সুতাংয়ে ৪। অথচ সুপেয় পানির জন্য মানদণ্ড হলো পিএইচ ৬ থেকে ৭।
এ ছাড়া এসব নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা জলজ প্রাণীর জন্য ভয়াবহ রকম কম। লবণদহে অক্সিজেনের মাত্রা ০.২১, হাঁড়িধোয়ায় ০.৬ এবং সুতাংয়ে ০.৪। যেখানে মাছ ও জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য অন্তত ৪ দশমিক ৫ মাত্রা থাকা জরুরি। ফলে দূষণ অব্যাহত থাকলে এসব নদী পুরোপুরি মৃতপ্রায় হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা সংস্থাটি।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নদী পুনরুদ্ধারের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু নদীর প্রাণই ফিরে আসবে না, বরং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যচাষ ও জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।