ঢাকা, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬, ৫:৩৫ অপরাহ্ন

খুব দ্রুতই একীভূত হচ্ছে শরীয়াভিত্তিক ৫ ব্যাংক

সপ্তাহখানেকের মধ্যেই শরীয়াভিত্তিক দুর্বল ৫ ব্যাংককে একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।  এ লক্ষ্যে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাতকারে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ওই পাঁচ ব্যাংকের বাইরে অন্তত ২০টি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে সরকারি ব্যাংকও।

জানা গেছে, গত এক বছরে চিহ্নিত এক ডজন দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল, ইউনিয়ন, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংকের সম্পদ মূল্যায়ন পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। দেখা গেছে, এসব ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬ শতাংশ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত। গভর্নরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হবে।

একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।

এই পাঁচটি ব্যাংক রূপ নেবে একটি ব্যাংকে। এটি হবে মূলত সরকারি মালিকানা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। নতুন ব্যাংকটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) অর্থায়নে বিশেষায়িত হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি লাইসেন্সে পরিচালিত হবে। একীভূত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সম্পদ, আমানত, দায়ভার এবং কর্মী কাঠামো একত্রে এই নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে আসবে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “আমানতকারীদের কোনও ধরনের ঝুঁকি নেই। সরকার প্রাথমিকভাবে মূলধন দেবে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক লাভজনক হলে সেই অর্থ লাভসহ ফেরত নেওয়া হবে।”

তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে নতুন ব্যাংক দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রিরও সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ সরকার মূলধন দিয়ে সংকটমুক্ত করলেও মালিকানা বেসরকারি হাতে চলে যেতে পারে।

শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বণ্টন পদ্ধতি

একীভূত হওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারমূল্য ও অভিহিত মূল্যের গড় হিসেবে নতুন ব্যাংকের শেয়ার পাবেন। উদাহরণস্বরূপ, এক বিনিয়োগকারীর কাছে এক্সিম ব্যাংকের ১০০ শেয়ার থাকলে (অভিহিত মূল্য ১০ টাকা, বাজারমূল্য ২ টাকা) মোট বাজারমূল্য হবে ২০০ টাকা। অন্য একজনের কাছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২০০ শেয়ার থাকলে (বাজারমূল্য ৩ টাকা) মোট বাজারমূল্য হবে ৬০০ টাকা। এই হিসাবে নতুন ব্যাংকে শেয়ার বণ্টন হবে ১:৩ অনুপাতে।

প্রথমদিকে লভ্যাংশ দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। কারণ ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা এখনও দুর্বল। প্রথম লক্ষ্য থাকবে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

চাকরি ও গ্রাহক সুরক্ষা

শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হলেও অন্য কর্মকর্তাদের চাকরি অন্তত তিন বছর অক্ষুণ্ণ থাকবে। গ্রাহকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্যাংকের গ্রাহক হবেন, ফলে লেনদেন ব্যবস্থায় কোনও বিঘ্ন ঘটবে না।

সামনে আরও একীভূতকরণ

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই পাঁচ ব্যাংকের বাইরে আরও অন্তত ২০টি ব্যাংক— যার মধ্যে সরকারি ব্যাংকও রয়েছে, ভবিষ্যতে একীভূত করার পরিকল্পনা আছে। তবে কোনও ব্যাংক বন্ধ করার পরিকল্পনা নেই। লক্ষ্য হলো, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা।

সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

এই একীভূতকরণের মাধ্যমে একটি বৃহৎ সরকারি ইসলামি ব্যাংক তৈরি হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন বাড়বে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরতে পারে। তবে ঝুঁকিও কম নয়—রাজনৈতিক প্রভাব যদি ফের জেঁকে বসে, তদারকি দুর্বল হয় বা সরকারি মূলধন সহায়তা অপচয় হয়, তাহলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেশের ব্যাংকিং খাতকে নতুনভাবে সাজানোর এক বড় সুযোগ। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক তদারকি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনার ওপর। এই শর্তগুলো পূরণ হলে নতুন ইসলামি ব্যাংক শুধু সংকট কাটিয়েই উঠবে না, বরং দেশের আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগ শুরুর দিকে নানা প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নীতিগত অস্থিরতার কারণে ব্যাহত হয়েছিল। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশের জন্য আধুনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা চালানো হলেও সরকার এখন পর্যন্ত ব্যাংক পুনরুদ্ধারের কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়নি।’

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘সরকার যদি অন্তত এক-দুটি বড় সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে সঠিকভাবে পুনর্গঠন করতো, তবে সেটাই হতো একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত।’

 

 

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ