রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ ক্রমশ ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছে। সম্প্রতি ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালায় কঠোরতা আনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীদের চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৭ শতাংশ। এর সঙ্গে অবলোপনকৃত ঋণ ও আদালতে ঝুলে থাকা অর্থ যোগ করলে এই পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের সরকারের সময়ে প্রভাব খাটিয়ে নেওয়া ঋণগুলোর প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কঠোর নীতিমালা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, এবং সুদহারের বাড়তি চাপের কারণে শিল্প খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ কয়েকশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানি আয় কমেছে এবং নতুন বিনিয়োগ প্রায় থেমে গেছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “নীতিমালার পরিবর্তনে ব্যবসায়ীদের বাঁচার পথ সংকুচিত হচ্ছে। মাত্র তিনটি কিস্তি বাকি থাকলেই গ্রাহককে খেলাপি ঘোষণা করার নিয়ম কার্যকর হওয়ায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে অনিচ্ছুক। তারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্ষমতায় পরিবর্তনের সম্ভাব্য দিক নিয়ে চিন্তিত। এ অবস্থায় অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের চাপে ব্যাংকগুলো তাদের মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েছে। ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি আরও প্রকট। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক স্থবিরতা আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট সমাধান, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং দুর্নীতি দমন না করা গেলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।