নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের অন্যতম মার্চেন্ট ব্যাংক এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের টাকা ছাড়া ই প্রায় ১২ কোটি টাকার শেয়ার হাতিয়ে নিয়ে পরিচালক বনে যান কামরুল হাসান। আর এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ২০১৬ সালে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্তির কাজ করে। এ সময়ে পরিচালক পদে থাকায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন কোম্পানির প্রি-আইপিও শেয়ার বিক্রয়ের নাম করে ১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা লুটপাট করেন। অর্থাৎ এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের শেয়ারসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত না পেয়ে দিশেহারা অবস্থায় আছে।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বিগত ২০২০ সালের ৮ জুলাইয়ে কামরুল হাসানের মাধ্যমে কাট্টলি টেক্সটাইল লিমিটেডের নয় লাখ প্রাইমারি শেয়ার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে তার বিও একাউন্টে এক কোটি এক লাখ টাকা জমা প্রদান করেন। পরবর্তিতে তিনি কাট্টলি টেক্সটাইল লিমিটেডের ৭,২৮,০০০ টি প্রাইমারি শেয়ার লিস্টিংয়ের পর তার বিও হিসাবে পান। বাকি ২,৬২,০০০টি প্রাইমারি শেয়ার তার বিও হিসাবে পাননি। এ বিষয়ে তিনি এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের নিকট অভিযোগ করেন। পরে এ অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রমাণ পায়, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ নয় লাখ শেয়ার ক্রয়ের জন্য কামরুল হাসানের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে চুক্তিবদ্ধ হন। আর লেনদেনটি শেষ না করে গ্রাহকের প্রাপ্য ২৭ লাখ টাকাসহ এনআরবি ইক্যুইটির শেয়ার কেনা, মধুসুদন দে, মোঃ মোতাহার হোসেন, মোঃ কামরুজ্জামান, খাজা আজিজ আহমেদ, মোঃ জাকির হোসেন ও সোহেল পারভেজসহ আরো বেশ কয়েকজন ব্যক্তি থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা জমা নেন এবং জমাকৃত টাকা গুলো বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকগণের এক হিসাব থেকে গ্রাহকের অন্য হিসাবে জমা করে সেখান থেকে নামে, বেনামে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বেশি টাকা আত্মসাত করেন। এরমধ্যে বিগত ২০১৯ সালে ২৮ জানুয়ারিতে পে-অর্ডার নম্বর ০৫৮৯৫৭৩ এর মাধ্যমে সর্বমোট দেড় কোটি টাকা সফটওয়্যার সলুশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পে-অর্ডার গ্রহণ করে অবৈধ পন্থায় আত্মসাত করেন। এ দেড় কোটি টাকা সফটওয়্যার সলুশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে পে-অর্ডার ইস্যু করে কামরুল হাসান নিজেই প্রাপক স্বাক্ষর করে গ্রহণ করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেড় কোটি টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে বেআইনী ভাবে আত্মসাত করেন। শুধু ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। একই ভাবে ম্যাট্রিস এগ্রো ফিশারিজ, এফএ ট্রেডিং কর্পোরেশন, ইউনাইটেড ফাইন্সিয়াল ট্রেডিং কোম্পানি, আবদুল আওয়অল, ফরিদ আহমেদ, বেনবিজ প্রাইভেট লিমিটেড,ডব্লিউ অ্যান্ড উব্লিউ কোম্পানি লিমিটেড, টিআর অ্যাসোসরিজ, বেকা গার্মেন্টস ও বি. ব্রাদার্স গার্মেন্টসের নামে ১৮ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা এনআরবি ইক্যুইটির ব্যাংক হিসাব তেকে চেকের মাদ্যমে তুলে নেয়। এছাড়া এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ৬৫ হাজার ৫০০ টি শেয়ার কেনার টাকা পরিশোধ করেননি। এসব শেয়ারের মূল্য ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর শেয়ার ট্রান্সফার ফি ও ম্যানেজমেন্ট ফিসহ মোট ১৪ কোটি ২৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বকেয়া। অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে কোম্পানির শেয়ারসহ গ্রাহক ও কোম্পানির হিসাবে সর্বমোট ৩২,৪৮,৭৭,৪৪৬ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। এসব লুটপাটের অভিযোগ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা অবহিত আছে।
অর্থ আত্মসার্তের লেনেদেনের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অভিযুক্ত কামরুল হাসান বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে নেওয়া চেক নিজে ই চেক গ্রহণ করে, আবার নিজ ই নিজ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের চেক প্রদান করে। তা আবার কামরুলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে তুলে নিত। অর্থাৎ ক্রস ট্রান্সজেকশন করে নিজেই ভোগ করত। যেমন কামরুল হাসান এনআরবি ইক্যুইটির চেক নিজের স্বাক্ষর করে তার মালিকানাধীন ম্যাট্রিস এগ্রো ফিশারিজের নামে সেকেন্ডারি বাজারের শেয়ার কেনার জন্য ইউনাইটেড ফাইন্সিয়াল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড নামক ব্রোকারেজ হাউজে ৫০ লাখ টাকা দেওয়া। একইভাবে ফরিদ আহমেদের মালিকানাধীন এফএ ট্রেডিংয়ের নামে দুই কোটি টাকা এবং ফরিদ আহমেদের নামে ২০ লাখ টাকাসহ মোট দুই ২০ লাখ টাকা এনআরবি ইক্যুইটির ব্যাংক হিসাব থেকে সরানো হয়। আবার এফএ ট্রেডিং থেকে কামরুল হাসান নিজে ও নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা তুলে নেওয়া হয় হয়। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে এসব লুটের টাকায় ফ্ল্যাট, গাড়ি, গুলশান নর্থ ক্লাবে সদস্য পদ নেওয়া, বিভিন্ন কোম্পানির প্লেইসমেন্ট শেয়ার কেনা, ব্রোকারেজ হাউজে নিজ বিওতে বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণসহ ইত্যাদি কাজে অর্থব্যয় করেন।
এ বিষয়ে এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড আর্থিক কার্যক্রম পরীক্ষার জন্য মেসার্স সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং (চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস) কে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গভীরভাবে নিরীক্ষার জন্য গত ২০২০ সালে ৫ ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ ধেয়। যথারীতি উক্ত স্পেশাল অডিটর সার্বিক পরীক্ষান্তে তাদের নিরীক্ষিত রিপোর্টটি একই বছরের ২৪ মার্চ তারিখে এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের নিকট দাখিল করেন। পরবর্তী পর্যায়ে উক্ত বহিঃঅডিটর রিপোর্ট অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কোম্পানির শেয়ারসহ গ্রাহক ও কোম্পানির হিসাবে সর্বমোট ৩২,৪৮,৭৭,৪৪৬ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। যার প্রেক্ষিতে এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড কর্তৃক কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে সি.আর মামলা ৬৮৫/২০২০ ও মানি মোকদ্দমা ৬১/২০২০ মামলা করেছিল। এ মামলায় ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন আসামি কামরুল। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর নিন্ম আদালতে জামিন চেয়ে বিফল হয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি। প্রতারণার মামলায় তথ্য গোপন করে জামিন আবেদনে ফেঁসে গেলেন কামরুল হাসান। ওই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো আদালতে জামিন আবেদন করতে পারবেন না বলে আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।
এ বিষয়ে কাট্টলি টেক্সটাইল লিমিটেড, অ্যাসোসিয়েট অক্সিজেন ও লুব-রেফ (বিডি) লিমিটেডের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, আমরা কয়েকজন ব্যক্তি থেকে শেয়ার বরাদ্দ না পাওনার অভিযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেইসব অভিযোগ সঠিক ছিল না। এমনকি আইপিও পাস হওয়ার পরও শেয়ার কেনা ভুয়া কাগজ দেখানো হয়। কারণ আমরা এসব ব্যক্তির কাছে থেকে শেয়ার বিক্রয়ের জন্য কোনো টাকাপয়সাও গ্রহণ করিনি। সুতরাং শেয়ার বরাদ্দ না পাওয়া নিয়ে অভিযোগ পুরোপুরি অসত্য। আমাদের আইপিওতে আসার জন্য ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক পরিচালক কামরুল হাসান বিভিন্নজন থেকে শেয়ার দেওয়ার নাম করে এসব অপকর্ম করেছিল বলে জানতে পারি। এর জন্য তিনি ১৭ মাস কারাগারে ছিলেন।
এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তা মোসলেহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, অডিটর রিপোর্ট অনুযায়ী কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে কোম্পানির শেয়ারসহ গ্রাহক ও কোম্পানির হিসাবে সর্বমোট ৩২ কোটি ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪৬ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ২০২০ সালে ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বরাবর কামরুল হাসানের (প্রাক্তন পরিচালক, এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড) ২০১৬-২০১৯ সালে সংঘটিত নানাবিধ আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে একটিপত্র প্রেরণ করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ৬৮৫/২০২০ মামলায় ইতোমধ্যে কামরুল হাসান ১৭ মাস হাজত বাসের পর পাসপোর্ট জমা প্রদান করে শর্ত সাপেক্ষে জামিনে আছে। উক্ত মামলার চার্জ গঠন হলে উক্ত চার্জ গঠনের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা ২৯৭/ ২০২২ দায়ের করা হয়। যা চলতি ১৩ মার্চ রিভিশন মামলাটি খারিজ হয় এবং মহানগর দায়রা জজ আদালত চার্জ গঠন বহাল রেখে সাক্ষীর জন্য দিনধার্য করে দেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য কামরুল হাসানের ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে উনার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।