অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে এই তিন দিন সরকারবিহীন অবস্থায় ছিল দেশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ছিল না। যার প্রভাব পড়েছে দেশের ক্রিকেটেও। জাতীয় দলের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে, ‘এ’ দলের পাকিস্তানযাত্রা পিছিয়ে গেছে, অক্টোবরে হতে যাওয়া টি২০ বিশ্বকাপও হুমকির মুখে পড়ে গেছে। বিপদ বুঝতে পেরে বিকল্প ভেন্যু প্রস্তুত রাখছে আইসিসি। রাজনৈতিক এই অস্থিরতা ক্রিকেটের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে! এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কোন পথে এগোবে!
তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে গত সোমবার পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। অবসান ঘটে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরই গণভবন, সংসদ ভবনসহ অনেক সরকারি অফিস, আওয়ামী লীগের অফিস ও নেতাদের বাসায় অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। সে সঙ্গে লুটপাটও চালায় দুর্বৃত্তরা। চরম অরাজক পরিস্থিতির কারণেই এই মুহূর্তে দেশে ক্রিকেট গৌণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ দল টেস্ট সিরিজ খেলতে ১৬ আগস্ট পাকিস্তান রওনা করবে। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এ সফরের প্রস্তুতি ব্যাহত হয়েছে।
বিসিবির একটি সূত্রে জানা গেছে, এর পরও পূর্বনির্ধারিত সময়েই দেশ ছাড়বে বাংলাদেশ দল। ২১ আগস্ট থেকে শুরু হবে টেস্ট সিরিজ। বিষয়টি নিয়ে বিসিবি ও পিসিবি (পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড) ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের পাকিস্তান যাওয়ার কথা ছিল গত মঙ্গলবার। কিন্তু দেশের এই পরিস্থিতির কারণে সেটা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১০ আগস্ট ইসলামাবাদের উদ্দেশে দেশ ছাড়বে ‘এ’ দল। ১৩ আগস্ট শুরু হবে ম্যাচ।
বাংলাদেশ নারী দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা থেকে এশিয়া কাপের সেমিতে খেলে ফেরা দলটিকে আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে ভালো করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতি দরকার। তাদের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি এই আন্দোলনে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপ সরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আগামী অক্টোবরে ১০ দলের এই আসরের ম্যাচগুলো মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম ও সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও আরব আমিরাতকে বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত রাখছে আইসিসি।
এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিসিবিকে কোন পথে নিয়ে যাবে? বিসিবির পরবর্তী নির্বাচন ২০২৫ সালের অক্টোবরে। কিন্তু বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে বর্তমান বোর্ডের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন চলতি বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের পর ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্বও পেয়েছিলেন। সংসদ সদস্য হয়েছিলেন বিসিবি পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। এ ছাড়া বিসিবি পরিচালক নাঈমুর রহমান দুর্জয় (সাবেক সাংসদ), আজম নাছির, শেখ সোহেল ও নাজিব আহমেদ আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শেষ দু’জন শেখ হাসিনার আত্মীয়ও।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তাদের কারোরই হদিস নেই। এর মধ্যে নাজমুল হাসানের বিদেশে চলে যাওয়ার গুঞ্জন রয়েছে, আবার দেশে আছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। এর মধ্যে ৫ আগস্ট রাতে তাঁর ভৈরবের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই নাজমুল হাসানকে হয়তো আর বিসিবিতে নাও দেখা যেতে পারে। তাই অন্তর্বর্তী বোর্ডের সম্ভাবনা শোনা যাচ্ছে। এটা অবশ্য নতুন নয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) বিসিবিতে অন্তর্বর্তী কমিটি করে দিয়েছিল। ২০১৩ সালে আ হ ম মুস্তফা কামাল আইসিসি প্রেসিডেন্ট হলে নাজমুল হাসানকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করে দেয় সরকার। বছরের শেষ দিকে তিনিই বিসিবির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হয়েছিলেন। এখনও হয়তো সে পথে হাঁটবে।
তবে এসব কেবলই সম্ভাবনার কথা। আইসিসি বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, সেটার ওপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু। কারণ আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী বোর্ডের ওপর কোনো দেশের সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। গত বছর এই অপরাধে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডকে দুই মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল আইসিসি। যে কারণে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব হারায় তারা। গত বছর পাকিস্তান সরকারও নির্বাচন ছাড়া পিসিবিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। তাদের ওপর অবশ্য কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি।