এ যেন নতুন করে নিজেদের দাবির পক্ষে বড় একটা সঙ্গী পেয়ে যাওয়া। যখনি মুসলিমদের কোন সুযোগ আসে তখনি তারা নির্যাতিত আর নিপীড়িত ফিলিস্তিনের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ে। দাঁড়িয়েছে কাতার বিশ্বকাপের সময়। এমনিতে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন অনেক আরব দেশেরই। সেটা হয়েছে সুবিধা দিয়ে কিংবা চাপে ফেলে। তাতে উপেক্ষিত হয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ফিলিস্তিনিদের লড়াই আর আত্মত্যাগ।
ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবিকে পাশ কাটিয়ে সে কূটনৈতিক সম্পর্ক ওই অঞ্চলে যেন স্বাভাবিকতার একটা চাঁদর বিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেটি যে ‘মেকি’ তা প্রমাণ করেছে কাতার বিশ্বকাপ। স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের লড়াই, তাদের আত্মত্যাগ দমিয়ে রাখার পরও যে মরে যায়নি, সেটাই দেখিয়েছে বিশ্বকাপ। এমনই দাবি দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জিব্রিল রাজুব। বিশ্বকাপ ভেন্যুর ভেতরে ও বাইরে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়তে দেখা গেছে অনেকবার।
কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ার পথে প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি উদযাপনে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার ও তাদের লড়াইকে সামনে নিয়ে এসেছেন মরক্কোর খেলোয়াড়রা। সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত এক এক করে ম্যাচ জিতেছে তারা, আর উদযাপনে নিজেদের দেশের পতাকার সাথে উড়িয়েছে ফিলিস্তিনের পতাকাও। মরক্কোর প্রতিটি ম্যাচ শেষেই কারও না কারও হাতে দেখা গেছে ফিলিস্তিনের পতাকা। আশরাফ হাকিমি, হাকিম জিয়েশরা দেখিয়েছেন, ফিলিস্তিনিরা তাদের ভাই, তাদের প্রতি সমর্থন থাকবে নিরন্তর। জিয়েশদের এই সমর্থনে গর্বিত ফিলিস্তিনের মানুষ। গর্বিত দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জিব্রিল রাজুবও, ‘সাম্প্রতিক ‘নরমালাইজেশন এগ্রিমেন্ট’ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের লড়াইকে কবর দেয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, এই বিশ্বকাপ সেটিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।’
মরক্কো বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠার পথে আফ্রিকান এবং আরব দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছে। নিজেদের দেশের মানুষের মতোই সমর্থন এসেছে ফিলিস্তিন থেকেও। রামাল্লার ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রির এক দোকানি সাঈদ আল-রামাহি জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে মরক্কো জাতীয় দলের কয়েক হাজার জার্সি বিক্রি করেছেন। তার ভাষায়, ‘যদি আমার কাছে ৩ লাখ জার্সিও থাকত, গত দুই দিনে তা বিক্রি হয়ে যেত।’ ২০২০ সালে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে মরক্কো। যে পদক্ষেপটা ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘পেছন থেকে ছুরিকাঘাতে’র মতো। দেশটির সে পদক্ষেপে ভীষণ মর্মাহত ফিলিস্তিনিরা। সে সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি করে মরক্কো। যে চুক্তির স্বপক্ষে ছিলেন না জিয়েশরা।
তারপরও মরক্কোর ওই চুক্তির কারণ, পশ্চিম সাহারায় বিতর্কিত এক অঞ্চলের ওপর রাবাতার সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ইসরায়েলের সাথে মরক্কোর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও ইসরাইলিদের সাথে ফিলিস্তিনিদের লড়াইয়ে মরক্কোর মানুষ বরাবরই সমর্থন দিয়ে এসেছে ফিলিস্তিনকে। তাদের প্রতি মরক্কোর মানুষের অব্যাহত সমর্থনের কথা নতুন করে তুলে ধরেছেন জিয়েশরা। তুলে ধরেছে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিনিদের নিরবচ্ছিন্ন আত্মত্যাগের গল্প। তেল আবিব থেকে প্রকাশিত হিব্রু ভাষার পত্রিকা দ্য মারিভ গত রবিবার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘বিশ্বকাপে মরক্কোর উৎসব প্রমাণ করেছে যে ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিককরণ থেকে আরব বিশ্ব অনেক দূরে।’ তাতে হয়তো ইসরায়েলের কিছু যাবে আসবে না। কিন্তু নিজেদের মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি পাবে চিরনিপীড়িত ফিলিস্তিনের মানুষ। এখানে মানসিক একটা বিজয় মনে করতে পারে ফিলিস্তিনিরা। আশাটা যে আরো দূরের বাতিঘর।