বিশ্বকাপ ফুটবলের মর্যাদার লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থকড়িও বেশ ভাল আয় করা যায়। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা তেমন একটা অর্থ না পেলেও কোচদের এখানে একটু ভিণ্ণভাবে পাওয়া যায়। কারণ খেলোয়াড়রা ক্লাব থেকে যে অর্থ পেয়ে থাকেন সেটা জাতীয় দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
মূলত দেশের প্রতি টান থাকার কারণেই তারা দেশের জার্সি গায়ে খেলে থাকে। সে হিসেবে বেশ কয়েকজন হাইপ্রোফাইল কোচকে দেখা যাবে কাতার বিশ্বকাপে। সবার পারিশ্রমিক কিন্তু আবার সমান নয়। ৩২ দলের কোচদের মধ্যে কে কত বেতন পান, তা নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে গবেষণা চালিয়েছে ‘ফাইন্যান্স ফুটবল’। তাদের গবেষণায় সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া কোচ হলেন, জার্মানির হ্যানসি ফ্লিক। তারপরই রয়েছে ইংল্যান্ডের গ্যারেথ সাউথগেট ও ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম। তালিকায় শীর্ষ সেরা দশের মধ্যেই জায়গা পেয়েছেন ব্রাজিলের লিওনার্দো বাচ্চি তিতে, পর্তুগালের ফার্নান্দো সান্তোস এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনিও। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, লুইস এনরিকের মতো নামকরা কোচ অর্থখড়ি কামাইয়ের পরিমাণের মধ্যে রয়েছেন ১৬ নম্বরে।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচও (৫৫ লাখ ইউরো) খুব একটা বেতন পান না। তালিকায় ২৪ নম্বরে ঠাঁই মিলেছে এই তরুণ কোচের। সবচেয়ে কম বেতন ১৩ লাখ ইউরো বাৎসরিক বেতন তিউনিসিয়ার কোচ জলিল কাদরি কাজ করে চলেছেন। শীর্ষ ১০-এর বাইরে তবে ২০-এর মধ্যে থাকা কোচরা হলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার পাওলো বেনতো (১.৩০ মিলিয়ন), অস্ট্রেলিয়ার গ্রাহাম আরনল্ড (১.৩০ মিলিয়ন), যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেগ বারহল্টার (১.২৫ মিলিয়ন), বেলজিয়ামের রবার্তো মার্টিনেজ (১.২০ মিলিয়ন), ডেনমার্কের ক্যাসপার হিয়ুলমান (১.১৫ মিলিয়ন), স্পেনের লুইস এনরিকে (১.১০ মিলিয়ন), সৌদি আরবের হার্ভে রেনার্ড (১.১০ মিলিয়ন), জাপানের হাজিমি মরিয়াসু (১.০৫ মিলিয়ন), মরক্কোর ভাহিদ হালিলহোদিচ (৯ লাখ ২০ হাজার), উরুগুয়ের দিয়েগো আলোনসো (৮৬ লাখ)। এর বাইরে আরও বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া কোচদের নিয়ে এবারের প্রতিবেদন সাজানো হয়েছে।
হ্যানসি ডিটার ফ্লিক (জার্মানি)
স্বর্নালী সময়েল হিসেব করলে ২০০৬ থেকে ২০২১ পর্যন্ত জার্মানির কোচ ছিলেন জোয়াকিম লো। তার অধীনে ব্রাজিলের মাটিতে প্রথম ইউরোপিয়ান দেশ হিসেবে ২০১৪ বিশ্বকাপ জেতে জার্মানরা। তবে ২০২০ ইউরোতে ব্যর্থতার পর গত বছরের ৯ মার্চ দায়িত্ব ছাড়তে হয় লো’কে। তার উত্তরসূরী হিসেবে বায়ার্ন মিউনিখকে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জেতানো হ্যানসি ফ্লিককে বেছে নেয় জার্মানি। জার্মান এই কোচের বাৎসরিক বেতন ধরা হয়েছে ৬.৫ মিলিয়ন ইউরো। যা টাকার অংকে সবার উপরে।
গ্যারেথ সাউথগেট (ইংল্যান্ড)
কোচ হিসেবে তার মেয়াদে এখনো পর্যন্ত প্রত্যাশিত কোনো সাফল্যই পায়নি ইংল্যান্ড। বিশেষ করে কোচ হিসেবে রায়ান সাউথগেট যোগ দেওয়ার পর। ২০১৬তে স্যাম অ্যালারডাইস কেলেংকারির পর যুব দলের কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের কাঁধে জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দেয় ইংল্যান্ডের ফুটবল। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত গত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান সাউথগেট। এছাড়া ২০২০ ইউরোতে সম্ভাবনা জাগিয়েও তার দল হয়েছে রানার্সআপ। স্বদেশি সাউথগেটের ওপর তাই এবারো আস্থা রেখেছে ইংল্যান্ড। তার বাৎসরিক বেতন ধরা হয়েছে ৫.৮ মিলিয়ন ইউরো।
দিদিয়ের দেশম (ফ্রান্স)
খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতার পর কোচ হিসেবেও জিতেছেন দিদিয়ের দেশম। ক্রীড়াজগতের অন্যতম সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্বও তিনি। খেলোয়াড় ও কোচ দুই ভূমিকায় জিতে ইতিহাসের পাতায় ঠাই করে নিয়েছেন। যদিও জাতীয় দলের কোচ হতে আগ্রহী ছিলেন আরেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় জিনেদিন জিদান। কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কোচ দেশমকেই কাতার কাফেলার প্রধান করে পাঠাচ্ছে ফ্রান্স। বছরে ৩.৮ মিলিয়ন ইউরো বেতন পান তিনি। তালিকায় যা তিন নাম্বারে।
লিওনার্দো বাচ্চি তিতে (ব্রাজিল)
নৈতিবাচক ফুটবল খেলা ব্রাজিলের কোচ কার্লোস ডুঙ্গাকে বাদ দিয়ে ২০১৬ সালে দায়িত্ব তুলে দেয়া হয় তিতের হাতে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দলটির কোচ হওয়া একদিকে যেমন সম্মানের, অন্যদিকে আবার চাপেরও। ২০১৬ থেকে সেই চাপ বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছেন তিতে। ৬ বছরে দলকে এনে দিয়েছেন একটি কোপা আমেরিকা শিরোপা, আরেকটিতে হয়েছে রানার্সআপ। তবে আসল চাওয়া বিশ্বকাপ স্বপ্ন এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে। গত আসরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়লেও ব্রাজিল বিশ্বাস রেখেছে তিতের ওপর, খেলাটা এশিয়ার মাটিতেঅনুষ্ঠিত হচ্ছে বিধায়। বছরে ৩.৬ মিলিয়ন ইউরো বেতন দিচ্ছে এই কোচকে। যা তালিকার চার নাম্বারে জায়গা করে নিয়েছে।
লুইস ভ্যান গাল (নেদারল্যান্ডস)
ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বেশি আলো ছড়িয়েছেন এই কোচ। এতক্ষণ যাদের বিষয়ে কথা বলা হলো, এদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ লুইস ভ্যান গাল। নেদারল্যান্ডসের এই কোচ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ক্লাব পর্যায়ে কোচিং করিয়েছেন আয়াক্স, বার্সেলোনা, বায়র্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দলকে। তার অধীনে এর আগেও দু’বার আন্তর্জাতিক আসরে খেলেছে নেদারল্যান্ডস। সর্বোচ্চ অর্জন ২০১৪ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করা। ২০১৭ সালে পারিবারিক কারণে নেদারল্যান্ডস দলের দায়িত্ব ছাড়েন ভ্যান গাল। দুই বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। তবে গত বছরের ৪ আগস্ট অবসর ভেঙে ফের নেদারল্যান্ডসের কোচের ভূমিকায় ফিরেছেন এই ঠান্ডা মাথার মানুষটি। তার বাৎসরিক বেতন ২.৯ মিলিয়ন ইউরো। যা তালিকার পাঁচ নাম্বারে রয়েছে।
জেরার্ডো টাটা মার্টিনো (মেক্সিকো)
নামটা অনেকের কাছে কি পরিচিত লাগছে? ২০১৩-১৪ পর্যন্ত এই আর্জেন্টাইন সাবেক খেলোয়াড় ছিলেন বার্সেলোনার দায়িত্বে। এর আগে ২০০৭-১১ পর্যন্ত প্যারাগুয়ে জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪-১৬ পর্যন্ত ছিলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচও। গত ২ বছর ধরে তিনি মেক্সিকোর ডাগআউট সামলাচ্ছেন। তিনবারের কোপা আমেরিকা রানার্সআপ (২০১১তে প্যারাগুয়ে ও ২০১৫, ২০১৬ তে আর্জেন্টিনার হয়ে) মার্টিনোকে বছরে ২.৯ মিলিয়ন পাউন্ড বেতন দিচ্ছে মেক্সিকো। তালিকায় যা ছয় নম্বরে অবস্থান।
লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা)
উপরের কোচদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে তরুণ লিওনেল স্কালোনি। অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে ওঠা এক আর্জেন্টাইন কোচ হিসেবে তার নাম উঠে আসে। ২০১৮তে কেয়ারটেকার কোচ হিসেবে ভালো করার পর স্কালোনিকে হেড কোচ বানিয়ে সবাইকে চমকে দেয় আর্জেন্টাইন এফএ। সেলেসাওদের দীর্ঘ ২৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশকে এনে দেন কোপা আমেরিকা ট্রফি। তার অধীনে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে আর্জেন্টিনা। পথে জিতেছে লা ফিনালিসিমা ট্রফিও। বিশ্বকাপের অন্যতম হট কোচ স্কালোনির বাৎসরিক বেতন ২.৬ মিলিয়ন ইউরো। যা তালিকায় সাত নম্বরে রয়েছে।
ফেলিক্স সানচেজ বাস (কাতার)
স্বাগতিক দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে একটু বেশিই চাওয়া কাতারের। দীর্ঘদিন (১৯৯৬-২০০৬) বার্সেলোনার যুব দলের কোচ ছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে কাতার অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর দায়িত্ব নেন অনূর্ধ্ব-২৩ দলের। সেখান থেকে প্রমাশন পেয়ে জাতীয় দল। বিশ্বকাপ আয়োজকদের বর্তমান দলটা ফেলিক্সেরই গড়া। বছরে ২.৪ মিলিয়ন ইউরো করে বেতন পাচ্ছেন এই স্প্যানিয়ার্ড কোচ। সর্বোচ্চ বেতন পাওয়াদের তালিকায় ৮ নম্বরে অবস্থান করছেন তিনি।
ফার্নান্দো সান্তোস (পর্তুগাল)
বিশ্বকাপে কোচদের মধ্যে বর্ষীয়ানের তালিকা করলে সেখানে উঠে আসবে ফার্নান্দো সান্তোসের নাম। স্বদেশি এই কোচ দিয়েই ২০১৬ ইউরোতে বাজিমাত করেছিল পর্তুগাল। প্রথমবার কোনো মেজর ট্রফি জয় করে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দল। ২০১৮ বিশ্বকাপে যদিও শেষ ষোলতেই বিদায় নিতে হয়েছে পর্তুগালকে, সুবিধা করতে পারেনি ২০২০ সালের ইউরোতেও। তবুও কাতারের জন্য সান্তোসের ওপরই ভরসা রেখেছে পর্তুগাল। বছরে ২.২৫ মিলিয়ন ইউরো বেতন দিচ্ছে এই কোচকে। যা তালিকায় নয় নম্বরে রয়েছে।
মুরাত ইয়াকিন (সুইজারল্যান্ড)
সুইজারল্যান্ড জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় মুরাত ইয়াকিন ২০২১ থেকে হেড কোচের ভূমিকায় আছেন। এফসি বাসেল, স্পার্তাক মস্কোর মতো নামী ক্লাবকে কোচিং করিয়েছেন। তার অধীনে গত ৯ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ ম্যাচে ৫ জয়, ৪ হার ও ৪ ড্র দেখেছে সুইজারল্যান্ড। মুরাত ইয়াকিনের বেতন ১.৬০ মিলিয়ন ইউরো। তালিকায় দশ নম্বরের মধ্যে সবার শেষে তার অবস্থান।