ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬, ৭:৪৮ পূর্বাহ্ন

চীনের উদ্যোগে বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য চুক্তি

বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন ধরনের প্রভাব বলয় তৈরি হতে যাচ্ছে রবিবার হতে যাওয়া এক চুক্তির বদৌলতে। যেখানে চীন ও আরও ১৪টি দেশ যুক্ত হচ্ছে।

রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নামে নতুন এই জোটের অর্থনীতির আয়তন বিশ্বের মোট জিডিপির ৩০ শতাংশ। ফলে, এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবাধ বাণিজ্য এলাকা তৈরি করবে।

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা এবং মেক্সিকোর মধ্যে যে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল রয়েছে সেটি বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও এশিয়ার নতুন এই বাণিজ্য অঞ্চলটির পরিধি বড় হবে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সিঙ্গাপুরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের চলতি শীর্ষ বৈঠকের শেষদিনে অর্থাৎ রবিবার এমন একটি বাণিজ্য চুক্তি সই হচ্ছে যা বিশ্ব বাণিজ্যে মৌলিক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। এমনটাই মন্তব্য বিশ্লেষকদের।

আসিয়ান জোটের ১০টি দেশ ছাড়াও এই চুক্তিতে সই করছে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। ভারতের এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ‘সস্তা চীনা পণ্যে’ তাদের বাজার ছেয়ে যাবে এই ভয়ে গত বছর আলোচনা থেকে বেরিয়ে যায়।

চুক্তির ফলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে জোট এলাকায় মধ্যে একে একে অধিকাংশ আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক উঠে যাবে। এর আওতায় থাকছে টেলিযোগাযোগ, মেধা-সত্ত্ব, ব্যাংক ও বিমার মতো আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও পেশাদারি সেবার মতো স্পর্শকাতর বিষয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— রুলস অব অরিজিন অর্থাৎ কোন দেশে থেকে পণ্য আসছে তার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারিত হবে।

কোনো সদস্য দেশ যদি তাদের উৎপাদিত পণ্যে ভিন্ন কোনো দেশের কাঁচামাল ব্যবহার করে তাহলে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকলেও তাদের আমদানি শুল্ক গুনতে হয়। যেমন, ইন্দোনেশিয়া যদি তাদের তৈরি কোনো যন্ত্রে অন্য কোনো দেশের আমদানি করা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে তাহলে আসিয়ানভুক্ত অন্য দেশে তা রপ্তানিতে শুল্ক দিতে হতে পারে।

তবে আরসিইপি চুক্তিতে সদস্য দেশগুলো থেকে যন্ত্রাংশ কিনলে রপ্তানিতে কোনো সমস্যা হবে না। এ বিষয়টিই আসিয়ান জোটের সদস্যদের নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। তার চেয়েও বড় আকর্ষণ চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ।

২০১২ সালে প্রথম এই চুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছিল। তারপর গত আট বছরে ধরে চীনের প্রবল উৎসাহ ও উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ব্যবসা বিষয়ক পরামর্শক সংস্থা আইএইচএস মারকিটের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ রাজিব বিশ্বাস এএফপি জানান. এই অঞ্চলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উদারীকরণে এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি। কারণ, আরসিইপি বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অঞ্চলে পরিণত হবে।

এ চুক্তিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের পথে একটি অভ্যুত্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয় থাইল্যান্ডের অন্যতম শীর্ষ দৈনিক ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদনে। সেখানে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাণিজ্যের অধ্যাপক আলেক্সান্ডার ক্যাপ্রি বলেন, “এই জোট চীনকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নে নিশ্চিতভাবে সাহায্য করবে।”

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে মুক্ত বাণিজ্য থেকে আমেরিকা যেভাবে পিছিয়েছে, সেই শূন্যস্থান দখল করছে চীন। ২০১৬ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১০টি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে টিপিপি নামে যে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি করেছিল, ট্রাম্প সেখান থেকে আমেরিকাকে বের করে নিয়ে যান।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন চুক্তিটি হলে ভবিষ্যতে এশিয়ায় বাণিজ্যের নীতি এবং শর্ত নিয়ন্ত্রণ করবে চীন।

ওয়াশিংটনের গবেষণা-ভিত্তিক সাময়িকী দি ডিপ্লোম্যাটকে গবেষণা সংস্থা কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ইভান ফেইগেনবম বলেন, “এশিয়ায় প্রধান দুই বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র নেই, ফলে এশিয়ায় বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের শর্ত ও মান নির্ধারণের ক্ষমতার হাতবদল হবে, এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে সে মতোই ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে।”

সাময়িকীটির সাবেক সম্পাদক অঙ্কিত পাণ্ডা টুইটে বলেন, “আরসিইপি চুক্তি যে হচ্ছে তাতে ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট যে এশিয়ায় বড় ঘটনা ঘটছে— এবং যুক্তরাষ্ট্র তাতে শামিল হোক বা না হোক আরও এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।”

জাপান-অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও চীনা আধিপত্য নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও আরইসিপিতে যোগ দিতে তারা পিছপা তো হচ্ছেই না, বরং সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মধ্যে এ নিয়ে উৎসাহ বাড়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

মালয়েশিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রী মোহামেদ আজমিন আলী বলেন, “গত আট বছর ধরে রক্ত, ঘাম আর চোখের জল ঝরিয়ে রবিবার আরসিইপি সইয়ের জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছি।”

তবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিণতিতে আসিয়ান জোটের দেশগুলো যে চরম অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এই চুক্তিতে সই করার ব্যাপারে তাদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

চীন বিশ্বের একমাত্র বড় কোনো দেশ যার অর্থনীতিতে এখনো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিছুদিন আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ঘোষণা করেছেন, আগামী ১০ বছরে চীন ২২ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করবে। তিনি বলেন, “চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার এবং এই বাজার আরও বড় হবে।” দিনে দিনে তাদের বাজার আরও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন প্রেসিডেন্ট।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চীনকে নিয়ে ওজর-আপত্তি-উদ্বেগ থাকলেও, তাদের এই বিশাল বাজারের অংশীদার হওয়ার জন্য এশিয়ার বহু দেশ উদ্‌গ্রীব।

এ দিকে আরসিইপিতে এমন কিছু দেশ রয়েছে যাদের কারো কারো মধ্যে বৈরিতা যেভাবে দিন-দিন বাড়ছে তাতে শেষ পর্যন্ত এটি কতটা কার্যকরী হবে তা নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে। যেমন, চীন-জাপানের মধ্যে কিছু দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বৈরিতা বেড়েই চলেছে। চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য রেষারেষির পারদ দিন দিন চড়ছে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ